ইএনটি বিশেষজ্ঞ: কান, নাক, গলা ও হেড-নেক রোগ, পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং কখন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন
সম্পূর্ণ গাইড / আলোচনা
অটোল্যারিঙ্গোলজি বা ইএনটি হলো কান, নাক, গলা এবং মাথা-ঘাড়ের সম্পর্কিত অংশের রোগ নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা। রোগ নির্ণয় সাধারণত বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়, এবং প্রয়োজনে অটোস্কোপ, এন্ডোস্কোপ বা নাসাল স্পেকুলামের মতো যন্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। রোগের ধরন অনুযায়ী শ্রবণ পরীক্ষা, ইমেজিং, অ্যালার্জি পরীক্ষা বা অন্যান্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসায় ওষুধ থেকে শুরু করে ছোট প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনে সার্জারি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ইএনটি বিশেষজ্ঞ কোন কোন রোগের চিকিৎসা করেন?
ইএনটি বিশেষজ্ঞ নিম্নলিখিত রোগ ও সমস্যার চিকিৎসা করতে পারেন:
- কানের সংক্রমণ
-
শ্রবণশক্তি হ্রাস
-
কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ (টিনিটাস)
-
কানে খৈল জমা
-
মাথা ঘোরা ও ভারসাম্যজনিত সমস্যা
-
সাইনোসাইটিস
-
দীর্ঘস্থায়ী নাক বন্ধ থাকা
-
নাকের পলিপ
-
নাকের হাড় বাঁকা থাকা
-
অ্যালার্জিক রাইনাইটিস
-
নাক দিয়ে রক্ত পড়া
-
টনসিল ও এডিনয়েডের সমস্যা
-
গলাব্যথা ও ফ্যারিঞ্জাইটিস
-
কণ্ঠস্বর পরিবর্তন ও গলা ভাঙা
-
খাবার গিলতে অসুবিধা
-
নাক ডাকা ও শ্বাসজনিত ঘুমের সমস্যা
-
ঘাড়ে চাকা বা ফোলা
-
লালাগ্রন্থির সমস্যা
-
মাথা-ঘাড়ের কিছু টিউমার
-
থাইরয়েড সম্পর্কিত কিছু সার্জিক্যাল সমস্যা, যা অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়
কিছু ক্ষেত্রে ইএনটি বিশেষজ্ঞ অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যাওয়া উপসর্গ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে পারেন।
কখন ইএনটি বিশেষজ্ঞ দেখাবেন?
নিচের সমস্যাগুলো থাকলে ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে:
- দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া কানব্যথা বা কান দিয়ে পানি পড়া
-
ধীরে ধীরে বা হঠাৎ শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া
-
কানে ক্রমাগত ভোঁ ভোঁ বা শোঁ শোঁ শব্দ
-
ঘন ঘন মাথা ঘোরা বা ভারসাম্যের সমস্যা
-
কয়েক সপ্তাহ ধরে সাইনাস কনজেশন
-
বারবার নাক দিয়ে রক্ত পড়া
-
নাক দিয়ে শ্বাস নিতে অসুবিধা
-
ঘন ঘন বা তীব্র গলাব্যথা
-
দুই-তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন
-
ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী চাকা বা ফোলা
-
খাবার গিলতে ব্যথা বা অসুবিধা
-
ঘুমের সময় জোরে নাক ডাকা ও শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া
হালকা মনে হওয়া কোনো উপসর্গ, যেমন সামান্য গলা ভাঙা বা মাঝেমধ্যে নাক বন্ধ থাকা, দীর্ঘদিন থাকলে বা বাড়তে থাকলে মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
কানের সাধারণ সমস্যা
কানের সংক্রমণ বাইরের, মাঝের বা ভেতরের কানে হতে পারে এবং ব্যথা, পানি পড়া, শ্রবণ সমস্যা বা জ্বর সৃষ্টি করতে পারে। শ্রবণশক্তি হ্রাস খৈল জমা, সংক্রমণ, বয়সজনিত পরিবর্তন, শব্দের কারণে বা অন্যান্য কারণে হতে পারে, এবং ইএনটি বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা ও শ্রবণ পরীক্ষার মাধ্যমে এর ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করতে পারেন। টিনিটাস বা কানে শব্দ শোনার একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। মাথা ঘোরা ও ভারসাম্যজনিত সমস্যা প্রায়ই ভেতরের কান থেকে উৎপন্ন হয় এবং এর কারণ নির্ণয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন দরকার হতে পারে।
নাক ও সাইনাসের সাধারণ সমস্যা
সাইনোসাইটিসে সাইনাসে প্রদাহ হয়, যা তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং মুখে চাপ অনুভব, নাক বন্ধ ও নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। নাকের হাড় বাঁকা থাকলে শ্বাসকষ্ট ও বারবার সাইনাসের সমস্যা হতে পারে। নাকের পলিপ নরম বৃদ্ধি, যা নাকের পথ বন্ধ করে দিতে পারে এবং গন্ধ অনুভূতি কমিয়ে দিতে পারে। অ্যালার্জিক রাইনাইটিসে হাঁচি, নাক বন্ধ ও নাক দিয়ে পানি পড়ে, এবং এর ব্যবস্থাপনা প্রায়ই সাইনাসের যত্নের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
গলা ও কণ্ঠস্বরের সাধারণ সমস্যা
টনসিলাইটিস ও ফ্যারিঞ্জাইটিসে গলাব্যথা, গিলতে অসুবিধা এবং কখনো কখনো জ্বর হয়। দীর্ঘস্থায়ী গলা ভাঙা বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ভোকাল কর্ডের সমস্যা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, অতিরিক্ত কণ্ঠস্বর ব্যবহার বা অন্যান্য কারণে হতে পারে। খাবার গিলতে অসুবিধার একাধিক গঠনগত বা কার্যকরী কারণ থাকতে পারে এবং এন্ডোস্কোপিক মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
মাথা ও ঘাড়ের সমস্যা
ইএনটি বিশেষজ্ঞ ঘাড়ের চাকা, লালাগ্রন্থির ফোলা এবং মাথা-ঘাড়ের কিছু বৃদ্ধিজনিত সমস্যাও মূল্যায়ন করেন। যেহেতু কিছু ঘাড়ের চাকা সংক্রমণ, প্রদাহ বা কম ক্ষেত্রে টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তাই দীর্ঘস্থায়ী বা বেড়ে যাওয়া চাকা চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত।
ইএনটি বিশেষজ্ঞ কীভাবে রোগ নির্ণয় করেন?
প্রথমে রোগীর ইতিহাস নেওয়া এবং কান, নাক ও গলা পরীক্ষা করা হয়।
প্রয়োজন অনুযায়ী করা হতে পারে:
- অটোস্কোপি (কান পরীক্ষা)
-
ন্যাসাল এন্ডোস্কোপি
-
ল্যারিঞ্জোস্কোপি
-
শ্রবণ পরীক্ষা (অডিওমেট্রি)
-
ভারসাম্য বা ভেস্টিবুলার পরীক্ষা
-
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই-এর মতো ইমেজিং
-
অ্যালার্জি পরীক্ষা
-
প্রয়োজনে বায়োপসি
-
সংক্রমণ সন্দেহে সোয়াব বা কালচার পরীক্ষা
সব রোগীর সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসকের পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচন করা হয়।
ইএনটির চিকিৎসা
রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা হতে পারে:
- মুখে খাওয়ার বা প্রয়োগযোগ্য ওষুধ
-
নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক
-
অ্যালার্জির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন ও নাসাল স্প্রে
-
কানের খৈল পরিষ্কার
-
শ্রবণযন্ত্র (হিয়ারিং এইড)
-
নাক বা সাইনাসের প্রক্রিয়া
-
প্রয়োজনে টনসিল বা এডিনয়েড অপসারণ
-
ভয়েস থেরাপি
-
ছোট আকারের চেম্বার প্রক্রিয়া
-
এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি
-
নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মাথা-ঘাড়ের সার্জারি
প্রতিটি ইএনটি সমস্যায় সার্জারির প্রয়োজন হয় না; অনেক সমস্যা ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।